Categories
Tips and Tricks

আলোর গতির মান কোন বিজ্ঞানী, কীভাবে মেপেছিলেন?


আলোর গতির মান কোন বিজ্ঞানী, কীভাবে মেপেছিলেন?

বিজ্ঞানে আলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আইনস্টাইনের বিখ্যাত আপেক্ষিকতার বিশেষ সূত্রগুলি আলোর ওপর (বিশেষ করে আলোর গতিবেগের ওপর) ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠিত। তবে আলো কী বা কী দিয়ে তৈরি, এর আচরণ কেমন, এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা আজও অনেকটা হিমসিম খান। একেক রকম পরীক্ষায় আলোর আচরণও একেক রকম বলে মনে হয়। ফলে, বিভিন্ন বিজ্ঞানীরা আলো সম্পর্কে বিভিন্ন রকম কথা বলে থাকেন।

বিজ্ঞানী নিউটন বলেছেন, ‘আলো’ হচ্ছে ছোট ছোট অসংখ্য কণিকা দিয়ে গঠিত এবং ওই কণিকাগুলির কোনো ওজন নেই। এই কণিকার নাম হলো ‘ফোটন’ (Photon)। যে কোনো উৎস থেকেই এই কণিকা অর্থাৎ ফোটনগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে বের হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

পদার্থ বিজ্ঞানী হাইগেন্স বলেন, ‘আলো’ চলে তরঙ্গের মতো করে।

এদিকে, আবার ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক বলে বসলেন আরেক কথা। তার মতানুসারে, ‘আলো’ চলে গুচ্ছ গুচ্ছ আকারে বা প্যাকেট আকারে (একে আলোর কোয়ান্টাম তত্ত্ব বলে)।

আলো সোজা পথে চলে। অর্থাৎ উৎস থেকে যেদিক দিয়ে বের হয়, ঠিক সেদিক দিয়ে সোজা চলতে থাকে। এঁকেবেঁকে অন্য কোনো দিক দিয়ে চলে যায় না। তবে শক্তিশালী কোনো চৌম্বক ক্ষেত্রের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় আলো সেই চৌম্বক ক্ষেত্রের দিকে কিছুটা বেঁকে যায়।

ক্লিয়ার?

আলোর নির্দিষ্ট গতিবেগ আছে এবং তা হলো শূন্যস্থানে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিন লাখ কিলোমিটার অর্থাৎ কোনো উৎস থেকে বের হয়ে এটি প্রতি সেকেন্ডে তিন লাখ কিলোমিটার করে দূরে চলে যাবে।

শূন্যস্থান/মহাশূন্য (পৃথিবীর বাইরে সমস্ত ফাঁকা জায়গাগুলোকে শূন্যস্থান বলা যেতে পারে) কথাটি বলার কারণ হলো, আলো বিভিন্ন মাধ্যমে বিভিন্ন বেগে চলে। তবে শূন্যস্থানেই আলো দ্রুত বেগে চলে। কারণ, শূন্যস্থানে আলো বাধা পায় না। তবে বাতাসের মধ্যে আলোর বেগ আর শূন্যস্থানে আলোর বেগ একই ধরা হয়। যদিও বাতাসের মধ্যে দিয়ে চলার সময় বাধা পাওয়ায় আলো একটু ধীরে চলে। খুব একটা ধীরে চলে না বলেই এই দুই স্থানের মধ্য দিয়ে আলোর বেগকে একই ধরা হয়।

তবে বিভিন্ন ‘মাধ্যম’-এর (Medium) ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আলাদা। মাধ্যম যত বেশি ঘন হবে, সেখানে আলোর বেগও তত কম হবে। যেমন- শূন্যস্থানে আলো যে বেগে চলে, পানির মধ্য দিয়ে তার চার ভাগের তিনভাগ বেগে চলে। অর্থাৎ পানিতে আলোর বেগ প্রতি সেকেন্ডে ৩/৪*৩০০০০০=২২৫০০০ কিলোমিটার বা দুই লাখ ২৫ হাজার কিলোমিটার। আর কাচের মধ্যে আলোর বেগ শূন্যস্থানের তিন ভাগের দুইভাগ বেগে চলে মাত্র।

কিন্তু কেন আস্তে চলে?

একটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা ক্লিয়ার করি। ধরা যাক, এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। রাস্তাটি ফাঁকা হলে তিনি যত জোরে হেঁটে যেতে পারবেন, রাস্তাটি যদি প্রচণ্ড ব্যস্ত থাকে, তাহলে তিনি খুব বেশি জোরে হাঁটতে পারবেন না। আলোর ক্ষেত্রেও বিষয়টা একই। সেই গুচ্ছ গুচ্ছ কণা অর্থাৎ ফোটনগুলো কোনো মাধ্যম দিয়ে যাওয়ার সময় মাধ্যমের সঙ্গে ধাক্কা খায়। ফলে তার চলার গতিও কমে যায় (এখানে মাধ্যমগুলোকে অবশ্যই স্বচ্ছ অর্থাৎ পানি বা কাচ হতে হবে। অস্বচ্ছ মাধ্যম যেমন- কাঠ, ঘরের দেওয়াল ইত্যাদি, এগুলোর মধ্যে দিয়ে আলো চলতে পারে না।)

এই পর্যন্ত ক্লিয়ার?

এখন তাহলে আলোর গতিকে পরিমাপ করা দেখি।

প্রশ্ন হলো, আলোর এমন প্রচণ্ড বেগ কীভাবে মাপা হয়? যে কোনো গাড়ির সঙ্গে গতি মাপার মিটার বসানো থাকে এবং সেই মিটার থেকেই বোঝা যায়, গাড়িটি ঘণ্টায় কত কিলোমিটার বেগে চলছে। কিন্তু আলোর সঙ্গে তো আর তেমন কোনো মিটার বা অন্য কোনো যন্ত্র বসানো সম্ভব নয়। কারণ, আলোকে ধরাও যায় না, আবার ছোঁয়াও যায় না। ওই ফোটনগুলো খুবই ছোট। এতই ছোট যে, এদের কোনো দাঁড়িপাল্লায় বসিয়ে ভর মাপতে গেলে কোনো ভারই পাওয়া যাবে না। অবশ্য বিভিন্ন যন্ত্রের মাধ্যমেও এর অস্তিত্ব বোঝা যায় না। এসব কারণেই এর গতিবেগ মাপার জন্য বিশেষ কোনো পদ্ধতির দরকার। আর এখন আমরা দেখবো, বিজ্ঞানীরা প্রথম কীভাবে আলোর গতিবেগ মাপলেন।

আলোর গতিবেগ এ রকম প্রচণ্ড হওয়ার কারণে প্রাচীনকালের বিজ্ঞানীদের এই গতিবেগ পরিমাপের সব ধরনের চেষ্টাই ব্যর্থ হয় এবং সতেরশ শতক পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, আলোর বেগ হলো ‘অসীম’। অর্থাৎ যা পরিমাপ করা সম্ভব নয়। যেমন- দেকার্তে নামে এক বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলোর বেগকে অসীম বলে দাবি করেন। অন্যদিকে, ১৬৬৭ সালে বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও দার্শনিক গ্যালিলিও আলোর বেগকে ‘সসীম’ বলে দাবি করেন ও সর্বপ্রথম তিনিই এর বেগ নির্ণয় করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার পদ্ধতিতে ভুল থাকায় আলোর বেগ নির্ণয় করতে ব্যর্থ হন তিনি।

পরে ১৬৭৫ সালে কোপেন হেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওলফ রোমার প্যারিসে কাজ করার সময় বৃহস্পতি গ্রহের একটি উপগ্রহের গ্রহণ পর্যবেক্ষণ করে সর্বপ্রথম আলোর বেগ নির্ণয় করেন। আর একেই বলা হয়, রোমারের জ্যোতির্বিদীয় পদ্ধতি।

তবে তিনি এই কাজটি করার জন্য অর্থাৎ বৃহস্পতি গ্রহের উপগ্রহটি পর্যবেক্ষণের জন্য যে টেলিস্কোপটি ব্যবহার করেন, তা গ্যালিলিওরই আবিষ্কার আর সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, তিনি যে উপগ্রহটি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই কাজটি করেন, সেটিও গ্যালিলিওই আবিষ্কার করেন (উপগ্রহটির নাম ‘আয়ো’)।

গ্যালিলিও ১৬১০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি একাটি টেলিস্কোপ আবিষ্কার করে সেটা দিয়ে বৃহস্পতি গ্রহ দেখতে থাকলেন। দেখতে দেখতে সেই সময়ই তিনি বৃহস্পতির চারটি উপগ্রহ আবিষ্কার করেন। উপগ্রহ চারটির নাম ‘আয়ো’, ‘ইউরোপা’, ‘গ্যানিমিড’ ও ‘ক্যালিস্টো’ এবং বর্তমান হিসাব পর্যন্ত এগুলোই বৃহস্পতির সবচেয়ে বড় উপগ্রহ।

এবার দেখা যাক, তিনি কীভাবে ‘আয়ো’-এর গ্রহণ পর্যবেক্ষণ করে আলোর গতি নির্ণয় করেন। তবে তার পদ্ধতিটি বর্ণনা করার আগে আমরা দুটি উদাহরণ দেখবো।

উদাহরণ ১: ধরা যাক, এক ব্যক্তি মাঠে একটি ফুটবল রেখে সেখান থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে তার চারপাশ দিয়ে বৃত্তাকার পথে হাঁটতে লাগলেন। আবার আরেক ব্যক্তি ওই ফুটবলটি থেকেই আরও কিছু দূরে গিয়ে একইভাবে ওই বলের চারপাশ দিয়ে বৃত্তকার পথে হাঁটতে লাগলেন।

এক্ষেত্রে বলের চারপাশ দিয়ে একবার ঘুরে আসতে প্রথম ব্যক্তির যে সময়টা লাগবে দ্বিতীয় ব্যক্তির তার চেয়ে বেশি সময় লাগবে। কারণ, দ্বিতীয় ব্যক্তিকে প্রথম ব্যক্তির চেয়ে বেশি পরিমাণ হাঁটতে হচ্ছে। আবার প্রথম ব্যক্তি যদি দ্বিতীয় ব্যক্তির তুলনায় দ্রুতগতিতে অর্থাৎ জোরে জোরে হাঁটেন তবে তিনি দ্বিতীয় ব্যক্তির চেয়ে আরও কম সময়ে বলটির চারপাশ দিয়ে হেঁটে আসতে পারবেন। আর এভাবেই তারা যদি হাঁটতে থাকেন, তাহলে একটি ঘটনা ঘটবে। তা হলো, ব্যক্তি দু’জন এক সময় পরস্পরের খুব কাছে চলে আসবেন। আবার আরেক সময় তারা পরস্পর থেকে খুব দূরে সরে যাবেন।



Source link