Categories
News

ছবিতে দেখানো ১৮৬৫ সালের মাথা ব্যথার চিকিৎসার পদ্ধতির দাবিটি মিথ্যা


১৮৬৫ সালে মাথা ব্যাথার চিকিৎসা” শীর্ষক শিরোনামে একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বেশ কয়েক বছর ধরে প্রচারিত হয়ে আসছে।

ফেসবুকে প্রচারিত কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে এখানে
পোস্টগুলোর আর্কাইভ ভার্সন দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানেএখানে

যা দাবি করা হচ্ছে

মাথা ব্যথার চিকিৎসা দাবিতে প্রচারিত ছবিগুলোতে দেখা যাচ্ছে এক ব্যক্তির মাথা একটি হাড়ির ভেতর ঢুকিয়ে কাঠের একটি হাতুরি দিয়ে হাড়িতে আঘাত করা হচ্ছে। দাবি করা হচ্ছে এই পদ্ধতিতে ১৯ শতকে স্থানীয় চিকিৎসকেরা মাথা ব্যথার চিকিৎসা করতেন। আর এই পদ্ধতির নাম “ভাইব্রেশন থেরাপি”।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯ শতকে মাথা ব্যথার চিকিৎসার পদ্ধতি দাবিতে প্রচারিত ছবিটি ভাইব্রেশন থেরাপির নয়। 

কি-ওয়ার্ড সার্চে, Mary Lydia Hastings Arnold Snow রচিত “Mechanical vibration” নামে প্রকাশিত একটি বইয়ে ভাইব্রেশনাল থেরাপির সম্ভাব্য কিছু চিত্র খুঁজে পাওয়া যায়।

বইটিতে ভাইব্রেটরকে হাতে ধরা যায় এমন ছোট একটি যন্ত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। যন্ত্রটির বর্ণনায় আরও বলা হয়েছে, পেশী এবং স্নায়ুর স্থুল চর্বি, হৃদযন্ত্রের রোগ, ল্যারিঞ্জাইটিস এবং নিউমোনাইটিস, হজমের ব্যাধি, অঙ্গ, গ্রন্থি ফুলে যাওয়া ইত্যাদি রোগের প্রতিকারে এই যন্ত্রের ব্যবহার হয়।

পরবর্তীতে, ইংল্যান্ডের ফিজিশিয়ান জোসেফ মর্টিমার গ্র্যানভিলে’র লেখা বই “Nerve-vibration and Excitation as Agents in the Treatment of Functional Disorder and Organic Disease.” তে ভাইব্রেটর সম্পর্কে আরও ধারণা পাওয়া যায়।

গ্রানভিলে তার বইতে বলেছেন, এই যন্ত্রে একটি ব্রাশ সংযুক্ত ছিলো, যা খুব সন্তর্পনে মাথার ত্বকে ডানে-বামে ও উপর-নীচ করে ঐ স্থান সুশৃঙ্খল্ভাবে মর্দন করে দিতো।

এরপর Peter J. Koehler, Christopher J. Boes রচিত ‘Brain’ বইয়ের ১৩৩ নাম্বার ভলিউমে “A history of non-drug treatment in headache, particularly migrain” শীর্ষক শিরোনামে একটি পরিচ্ছেদ পাওয়া যায়। 

বইটি থেকে জানা যায়, ১৯ শতকের শেষে, জিন-মার্টিন চারকোট এবং পরে তাঁর ছাত্র জর্জেস গিলস দে লা ট্যুরেট পারকিনসন্স রোগের জন্য ভাইব্রেশন থেরাপি ব্যবহার করেছিলেন।পরবর্তীতে, এটি মাথাব্যথা এবং মাইগ্রেনের চিকিৎসায়ও  প্রয়োগ করা হয়।

ব্রেইন নামক এই বইটিতেও ভাইব্রেশন থেরাপির চিত্র হিসেবে জোসেফ মার্টিমার গ্র্যানভিলের বইয়ে দেখানো চিত্রটি দেখানো হয়েছে।

Brain বইটি ১৯ শতকে মাথা ব্যথার চিকিৎসায় ভাইব্রেশন থেরাপি ছাড়া কাপিং(উষ্ণ একটি গ্লাস কপালে বা ঘাড়ে বসিয়ে দেওয়ার ফলে ওই স্থানের মাংস কিছুটা ফুলে ওঠে যা সাময়িক আরাম দেয়), রক্তপাত (কপালের কোনো শিরা বা ধমণী কেটে রক্ত পাত ঘটানো হতো। ধারণা করা হতো রক্তপাতের ফলে মাথা ব্যথা কমে যাবে) এর মতো কিছু চিকিৎসার উল্লেখ থাকলেও হাড়ির ভেতর মাথা ঢুকিয়ে হাড়িতে আঘাত করার মতো কোন চিকিৎসার তথ্য পাওয়া যায়নি।

রিভার্স ইমেজ সার্চে আলোচিত হাড়ির ভেতর মাথা ঢোকানো অবস্থায় হাড়ির ওপর আঘাত করার ছবিটির কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি বা ছবিটি কোন ঘটনার সে সম্পর্কেও কোনো তথ্য পাওয়া যায় নি। তবে, ‘Snopes.com’ এ “An 1895 Headache Treatment Called ‘Vibration Therapy’?” শীর্ষক শিরোনামে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, এই ছবিটি ১৯ শতকের ভাইব্রেশন থেরাপির ছবি নয়। ছবিটির উৎস সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে, ধারণা করা যায় যে, একাধিক ছবির মিশেলে এই ছবিটিকে তৈরী করা হয়েছে।

পরবর্তীতে, Leadstories.com এ  “Fact Check: Photo Does NOT Show ‘Vibration Therapy’ Treatment In 1890s” শীর্ষক শিরোনামে একটি প্রতেবদন খুঁজে পাওয়া যায়।

এই প্রতিবেদনটিতেও বলা হয়েছে, ছবিটি ২০ শতকের অনেকগুলো ছবির মিশেলে তৈরীকৃত একটি ছবি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে ভাইব্রেশন থিওরির অস্তিত্ব সত্যিই রয়েছে। তবে এই ছবিটি সেই থিওরির উদাহরণ নয়।

মূলত, ১৯ শতকে অর্থাৎ, ১৮০০ থেকে ১৯০০ সালে চিকিৎসা শাস্ত্র খুব একটা উন্নত না থাকায় স্থানীয় চিকিৎসকেরা নানা উপায়ে রোগমুক্তির প্রচেষ্টা করতেন। চিকিৎসা শাস্ত্রে ওষুধ আবিষ্কারের পূর্বে নানা ধরণের কর্তন-মর্দনের উপরই নির্ভরশীল থাকতে হতো মানুষকে। ভাইব্রেশন থেরাপি তেমনই একটি মর্দন থেরাপি যা মাথা ব্যথা উপশপে ব্যবহৃত হতো। তবে, ভাইব্রেশন থেরাপি ১৯ শতকে বিদ্যুৎ আবিষ্কারের পরের থেরাপি। যে যন্ত্রটি দ্বারা ভাইব্রেশন বা কম্পন তৈরী করা হতো তা একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্র ছিলো। যা, অত্যন্ত সন্তর্পণে হালকাভাবে মাথার ত্বকে সুশৃঙ্খলভাবে মর্দন করে দিতো। সহজ করে বললে, ভাইব্রেশন থেরাপিতে প্রকৃতপক্ষে যন্ত্র দ্বারা রোগীর মাথা টিপে দেওয়া হতো। পরবর্তীতে এই ভাইব্রেশন থেরাপির নাম দিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া হাড়ির ভেতর এক ব্যক্তির মাথা ঢোকানো অবস্থায় হাড়ির গায়ে আঘাত করার ছবিকে ১৮৬৫ সালে মাথা ব্যথার চিকিৎসার ছবি দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রচার করা হচ্ছে।

সুতরাং, ১৮৬৫ সালে মাথা ব্যথার চিকিৎসার দাবিতে হাড়ির ভেতর ব্যক্তির মাথা ঢোকানো অবস্থায় হাড়িতে আঘাত করার যে ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধম ফেসবুকে প্রচারিত হয়ে আসছে; তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।

তথ্যসূত্র



Source link