Categories
News

স্ট্রিকনিন নামে কোনো হরমোন নেই


সম্প্রতি “আমাদের অজান্তে শুধু হালাল খাবারই খাওয়ানো হচ্ছে। রীতিমত বুক ফুলিয়ে। দেখুন প্রমাণ।” শীর্ষক শিরোনামের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।

যা দাবি করা হচ্ছে

গত ১০ অক্টোবর ফেসবুকে Supriyo Live নামক একটি পেজে প্রকাশিত একটি ভিডিওর ক্যাপশনে (আর্কাইভ) দাবি করা হয়, “একটা সত্য জেনে রাখুন, হালাল পদ্ধতিতে কোনো পশুকে হত্যা করা হলে তার মাংসে স্ট্রিকনিন নামক ঘাতক হরমোন প্রচুর মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ে। এই স্ট্রিকনিন হরমোন অধিকাংশ ক্যান্সারের নেপথ্য নায়ক।” 

একই দাবিতে ফেসবুকের আরেকটি পোস্ট দেখুন এখানে। পোস্টের আর্কাইভ ভার্সন দেখুন এখানে

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, স্ট্রিকনিন নামে একটি ঘাতক হরমোন থাকার দাবিটি সঠিক নয় বরং একই নামে একটি কীটনাশক থাকার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সংস্থা সিডিসি। 

কি-ওয়ার্ড সার্চের মাধ্যমে, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সংস্থা Centers for Disease Control and Prevention এর ওয়েবসাইটে Facts About Strychnine শিরোনামে একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, স্ট্রিকনিন হল একটি সাদা, গন্ধহীন, তিক্ত স্ফটিক পাউডার যা মুখ, শ্বাস বা দ্রবণে মিশ্রিত করে নেওয়া যেতে পারে এবং সরাসরি শিরায় ইনজেকশনের মাধ্যমেও দেওয়া হয়। স্ট্রিকনিন একটি শক্তিশালী বিষ। মানুষের মধ্যে গুরুতর প্রভাব তৈরি করার জন্য শুধুমাত্র এটি অল্প পরিমাণই যথেষ্ট। স্ট্রিকনিন বিষ মৃত্যু সহ অত্যন্ত গুরুতর প্রতিকূল স্বাস্থ্যের প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের Temple University এর গবেষকদের প্রকাশিত একটি বইয়ে বলা হয়েছে, স্ট্রিকনিন শত শত বছর ধরে বিস্তৃত রোগের ঔষধি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যদিও এটি এখন একটি বিরল বিষক্রিয়ার এজেন্টে পরিণত হয়েছে। বইতে উপাদানটিকে বিষ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। 

কোথায় মেলে স্ট্রিকনিন?

স্ট্রিকনিনের প্রাথমিক প্রাকৃতিক উৎস হল স্ট্রিকনোস নাক্স-ভোমিকা (Strychnos nux-vomica) উদ্ভিদ। এই উদ্ভিদটি দক্ষিণ এশিয়া (ভারত, শ্রীলঙ্কা এবং ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ) এবং অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া যায়।

Figure 1. Strychnos nux-vomica L. (1) whole plant, (2) the fruit and (3) the seeds: (A) crude seeds and (B) processed seeds. Credit: Zhuju Wang

অতীতে স্ট্রিকনিন একটি বড়ি আকারে পাওয়া যেত এবং এটি অনেক মানুষের অসুস্থতার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হত। বর্তমানে স্ট্রিকনিন প্রাথমিকভাবে কীটনাশক হিসাবে ব্যবহৃত হয়, বিশেষ করে ইঁদুর মারার জন্য। তবে এলএসডি, হেরোইন এবং কোকেনের মতো মাদকের সাথে স্ট্রিকনিন মেশাতে দেখা যায়।

শরীরে স্ট্রিকনিনের প্রভাব কতটা?

সিডিসি জানিয়েছে, স্ট্রিকনিন দ্বারা সৃষ্ট বিষক্রিয়া কতটা কাজ কার্যকর হবে তা নির্ভর করে এর পরিমাণ, কোথায় দেওয়া হচ্ছে এবং যাকে দেওয়া হচ্ছে তার শারীরিক অবস্থার উপর। 

স্ট্রিকনিন পেশীতে স্নায়ু সংকেত নিয়ন্ত্রণকারী রাসায়নিকের সঠিক প্রক্রিয়াকে বাধা দেয়। রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ু সংকেতগুলো পেশীগুলোর জন্য শরীরের “অফ সুইচ” এর মতো কাজ করে। যখন এই “অফ সুইচ” সঠিকভাবে কাজ করে না, তখন সারা শরীর জুড়ে পেশীগুলোর তীব্র, বেদনাদায়ক খিঁচুনি হয়। যদিও ব্যক্তির চেতনা বা চিন্তাভাবনা প্রথমে প্রভাবিত হয় না (ব্যতিক্রম যে ব্যক্তিটি খুব উত্তেজনাপূর্ণ এবং ব্যথায় আচ্ছন্ন থাকে), অবশেষে পেশী ক্লান্ত হয় এবং ব্যক্তি শ্বাস নিতে পারে না।

স্ট্রিকনিনের বিষক্রিয়ার কারণে সৃষ্ট ক্ষতির ফলে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব দেখা দিতে পারে (উদাহরণস্বরূপ, কম অক্সিজেন থেকে মস্তিষ্কের ক্ষতি, কিডনি ফেইলিওর)। স্ট্রিকনিন বিষক্রিয়ায় গুরুতরভাবে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই।

হালাল উপায়ে পশু জবাইয়ে ক্ষতি? 

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম The Times of India নয়াদিল্লির অ্যাপেলো হসপিটালের পুষ্টিবিদ ডা. কারুণা চতুর্বেদীর বরাতে জানিয়েছে, “হালাল উপায়ে জবাইকৃত প্রাণীর মাংস বেশি স্বাস্থ্যসম্মত কেননা, জবাইয়ের পর কিছুক্ষণ হৃদপিণ্ড সক্রিয় থাকায় ধীরে ধীরে ধমনি বেয়ে রক্ত বের হয়ে যায়। বিষাক্ত পদার্থ-সহ এই রক্ত মানব শরীরের জন্য ক্ষতিকর। অন্যদিকে, ঝটকা (সচরাচর পদ্ধতি) মাংসে রক্ত সম্পূর্ণ বের হয় না, মাংস শক্ত ও শুষ্ক হয়ে যায়।”

কী বলছেন সুপ্রিয় বন্দোপাধ্যায়?

Supriyo Live পেজ থেকে প্রথম স্ট্রিকনিন বিষয়ক পোস্ট ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এ বিষয়ে জানতে পেজটির এডমিন সুপ্রিম বন্দোপাধ্যায়ের সাথে যোগাযোগ করে রিউমর স্ক্যানার টিম। স্ট্রিকনিনকে হরমোন দাবির সূত্র জানতে চাইলে জনাব সুপ্রিম রিউমর স্ক্যানারকে জানান, “ইউরোপে থাকাকালীন ইউরোপীয় ইউনিউনের ফুড সার্টিফিকেশনের সাথে তার যোগাযোগ ছিল। তাদের থেকেই তিনি এই হরমোন বিষয়ে জানতে পারেন।”

ইউরোপীয় ইউনিয়ন যা জানালো?

সুপ্রিয়’র দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগাযোগ করে রিউমর স্ক্যানার টিম। ইউরোপীয় ইউনিয়নের শাখা প্রতিষ্ঠান European Chemicals Agency এর Communications Unit এর Press Officer Nedyu YASENOV এর কাছে স্ট্রিকনিন নামে কোনো হরমোন আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি রিউমর স্ক্যানারকে জানান, “প্রকৃতপক্ষে স্ট্রিকনিন পদার্থটি বিদ্যমান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন দ্বারা অনুমোদিত সামঞ্জস্যপূর্ণ শ্রেণীবিভাগ এবং লেবেল অনুসারে, এই পদার্থটি গিলে ফেলা হলে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়। একইসাথে ত্বকের সংস্পর্শে মারাত্মক। এটি দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সহ জলজ জীবনের জন্য অত্যন্ত বিষাক্ত।”

মূলত, স্ট্রিকনোস নাক্স-ভোমিকা নামক উদ্ভিদের একটি উপাদান স্ট্রিকনিন। অতীতে স্ট্রিকনিন বড়ি আকারে পাওয়া যেত এবং এটি অনেক মানুষের অসুস্থতার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে সিডিসি একে একটি শক্তিশালী বিষ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছে, মানুষের মধ্যে গুরুতর প্রভাব তৈরি করার জন্য শুধুমাত্র এটি অল্প পরিমাণই যথেষ্ট। কিন্তু স্ট্রিকনিনকে একটি ঘাতক হরমোন দাবিতে সম্প্রতি ফেসবুকে প্রচার করা হচ্ছে যা মিথ্যা। স্ট্রিকনিন নামক বিষাক্ত একটি উপাদানের অস্তিত্ব থাকার বিষয়টি ইউরোপীয় ইউনিউনের সংশ্লিষ্ট শাখা রিউমর স্ক্যানারকে নিশ্চিত করেছে। 

সুতরাং, স্ট্রিকনিন নামে কোনো হরমোন নেই।

তথ্যসূত্র



Source link

Leave a Reply