Categories
Tips and Tricks

ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে যেসব ভুল ধারণা ক্যারিয়ারে অন্তরায় | Techtunes


ফ্রিল্যান্সিং কি?

নির্দিষ্ট কোন ধরাবাঁধা চাকরি না করে স্বাধীনভাবে নিজের সেবা প্রদান করাকে ফ্রিল্যান্সিং বলে। ধরুন একটি ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানে ড্রাইভারের প্রয়োজন আছে, প্রতিদিনই যেহেতু ড্রাইভারের সার্ভিস প্রয়োজন, তাই মাসিক চুক্তিতে একজন বেতনভুক্ত ড্রাইভার তারা রেখে দেন। সেই প্রতিষ্ঠানের এসি নস্ট হয়ে গেছে। এখানে  একজন এসি টেকনিশিয়ানের সেবা তার প্রতিদিন দরকার নেই। তাই সাময়িকভাবে একজনকে হায়ার করে, সেই সময়ের জন্য কিছু পরিমান পারিশ্রমিক দিয়ে দেবে। টেকনিশিয়ানের এই চুক্তিভিত্তিক কাজটিই ফ্রিল্যান্সিং।

এখানে টেকনিশিয়ান যদি বেতনভুক্ত হত, তাহলে সে প্রতিদিন ৮ ঘন্টা মাসে ২৫ দিন ডিউটি করে ২০ হাজার টাকা বেতন পেতে পারতেন। সেই ক্ষেত্রে প্রতি ঘন্টায় তাঁর আয় হত ১০০ টাকা। অন্যদিকে বেতনভুক্ত না হওয়ার কারনে ১ ঘন্টায় একটি নস্ট এসি ঠিক করে দিয়ে সে বিল নিচ্ছে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা। তাই আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় যে, ফ্রিল্যান্সার এসি টেকনিশিয়ান, বেতনভুক্ত এসি টেকনিশিয়ান থেকে ৫-১০ গুন বেশি আয় করছে।

ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ে অপপ্রচার

বাংলাদেশে অনেক প্রতিষ্ঠানই নিজেদের স্বার্থে ফ্রিল্যান্সিং কে অনেক সহজ হিসেবে রিপ্রেজেন্ট করে। ৩ মাসের ট্রেইনিং করলেই মাসে আয় ১ লক্ষ টাকা। কোর্স চলাকালিনই আয় করা শুরু। আয় করেই কোর্স ফী পরিশোধ করুন ইত্যাদি অনেক লোভনীয় অফার দিয়ে কোর্সে ভর্তি করা হয়। এই ভর্তি হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে থেকে ২-১ জন হয়তো সফল হয়। মাঝখান থেকে এই প্রতিষ্ঠান মাসে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করে। আর, পরিবার থেকে চেয়েচিন্তে টাকা নিয়ে এসে ভর্তি হওয়া প্রশিক্ষণার্থী হয় হতাশ।

বাস্তবে ফ্রিল্যান্সিং এর প্রেক্ষাপট কেমন?

প্রথমত অনলাইনে ফ্রিল্যান্সিং মানে হচ্ছে যে সকল সার্ভিস দূর থেকে দেয়া সম্ভব, এরকম সার্ভিস গুলো সেল করা। একজন কাঠমিস্ত্রি কিন্তু ভিডিও কলের মাধ্যমে দূর থেকে ফার্নিচার তৈরি করে দিতে পারবে না, তাই তার এই সেবা ফ্রিল্যান্সিং করা সম্ভব নয়। কিন্তু একজন একাউন্টেন্ট দূর থেকেই একটি কোম্পানির হিসাব-নিকাশ দেখাশোনা করতে পারেন। একজন ডাক্তার চাইলেই দূর থেকে রোগী দেখতে পারেন। অলরেডি টেলি-মেডিসিন বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়।

বাংলাদেশে যারা ফ্রিল্যান্সিং করছেন, তারা মূলত গ্রাফিক্স ডিজাইন, ওয়েব ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, এনিমেশন সহ আরো অনেক সেক্টরে কাজ করছেন। বিদেশীরা এই সকল কাজ অনলাইনের মাধ্যমে আমাদের দিয়ে করাচ্ছে, কারণ তাদের দেশে এই কাজগুলোর মূল্য অনেক বেশি। আমরা তুলনামূলক কম টাকায় করে দিচ্ছি, তাই। আর এই কম টাকাই আমাদের কাছে অনেক বেশী, কারণ আমাদের লোকাল মার্কেটের তুলনায় অনেক বেশী। একটা ছোট ডিজাইন করে ২০ ডলার পেলেই আমাদের বাজারে ২০০০ টাকা হয়ে যায়, যেই ডিজাইন দেশের কোন প্রতিষ্ঠানের জন্য করলে হয়তো ২০০-৫০০ টাকা পাওয়া যেত।

গ্রাফিক্স ডিজাইন, ওয়েব ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং এই সেবাগুলো অনলাইনে দেয়ার জন্য ভাসা ভাসা ভাবে কাজ জানাই কিন্তু যথেষ্ট না। বরঞ্চ এক্সপার্ট হতে হয়। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর শিখে যেতে হয়, যেন ক্লায়েন্ট যেভাবে চায় ঠিক সেভাবেই ডেলিভারি দেয়া যায়। ক্লায়েন্টের চাহিদামত কাজ করে দিতে না পারলে আছে নেগেটিভ রিভিউ এর ভয়। আর প্রথম দিকেই নেগেটিভ রিভিউ হয়ে উঠতে পারে বিশাল বাধা।

দীর্ঘ দিন কাজ করতে করতে যাদের ক্লায়েন্ট অনেক বেশি, তারা চাইলে কাজের রেট বাড়িয়ে দিতে পারে। তাদের প্রোফাইল ভারি হওয়ার কারনে ক্লায়েন্টরাও বেশী টাকা দিয়ে কাজ করিয়ে নেয় তাদের কাছ থেকে। কাজ বেশী এবং কাজের রেইট বেশি হওয়ার কারনে এই সকল পুরাতন এবং দক্ষ ফ্রিল্যান্সাররা প্রচুর টাকা আয় করেন। তারা মাসে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করেন, এটা যেমন সত্য, তেমনি এটাই কঠিন সত্য যে, নতুন কেউ সেই অবস্থানে যেতে হলে লম্বা সময় ধরে কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য দরকার। পাশাপাশি দরকার মেধা এবং ভাগ্য সহায় হওয়া।

যারা ১-২ মাসের ট্রেইনিং করে অনেক টাকা আয় করছে, তাদের বিষয়ে কি বলবেন?

উপরে যে পদ্ধতিগুলো বলা হয়েছে, সেটাই হচ্ছে সঠিক ফ্রিল্যান্সিং। এর বাইরে ফ্রিল্যান্সিং এর মোডকে অনেক অবৈধ এবং অনৈতিক কাজকেও প্রমোট করা হচ্ছে। এই কাজগুলোর অধিকাংশই প্রতারণামূলক। সার্ভে, সিপিএ মার্কেটিং, ক্রেগলিস্ট এরকম অনেক সেক্টর ব্যবহার করে প্রতারণামূলক কাজ করা হয়।

একটি উদাহরণ এরকম, ধরুন সিপিএ মার্কেটিং এ এমন একটা অফার পাওয়া গেল যে, এই ওয়েবসাইটে আমেরিকান লোকজনকে একাউন্ট খোলাতে পারলে প্রতি একাউন্টে ১০ ডলার করে পাওয়া যাবে। এখন অনেকে ভুয়া সোশ্যাল মিডিয়া একাউন্ট নারীদের নাম এবং ছবি ব্যবহার করে খুলে আমেরিকানদের সাথে চ্যাট করে। তারপর তাদের এখানে একাউন্ট খুলতে প্রলোভিত করে।

অন্য এক জায়গায়, একটি জরিপে অংশ নিতে হবে রাশিয়ান একজনকে, যে কি না একটি রাশিয়ান পণ্য/সেবা ব্যবহার করেছেন। এখন কেউ কেউ রাশিয়ান আইপি এড্রেস ব্যবহার করে ভুয়া পরিচয়ে সার্ভে কমপ্লিট করে টাকা নিয়ে নিচ্ছে।

প্রতারণা বা অনৈতিক বিষয়গুলো বাস্তব জিবনে যেমন অপরাধ, অনলাইনেও অপরাধ। অথচ অনলাইনে অপরাধ করে ধরা পড়া কিংবা শাস্তি পাওয়ার সংখ্যা কম বলে আমরা এখন এই কাজগুলোকে অপরাধ বলে মনেও করছি না। তা ছাড়া এগুলো কারো ক্যারিয়ার হতেও পারে না।

ফ্রিল্যান্সিং এ ক্যারিয়ার তৈরির সঠিক পদক্ষেপ কি হতে পারে?

প্রথমত দ্রুত ইনকাম করার লোভ সংবরন করে দীর্ঘদিন লেগে থাকার মানসিকতা থাকতে হবে। শেখার প্রতি প্রচুর আগ্রহ থাকতে হবে এবং সময় দিতে হবে, তাহলেই সফল ফ্রিল্যান্সার হওয়া যাবে। সম্ভব হলে ভালো একজন মেন্টরের সংস্পর্শে থেকে সাপোর্ট নিতে হবে। অনলাইনে বিভিন্ন কমিউনিটি গুলোতে একটিভ থেকে, আপনি যে কাজ শিখছেন সেটির খুটিনাটি বিষয়গুলো জানতে হবে। ইউটিউব থেকে বিভিন্ন কোর্সের সম্পূর্ণ প্লেলিস্ট দেখে এবং প্র্যাকটিস করে কমপ্লিট করতে হবে।

আজ থেকে শুরু করলে প্রতিদিন ২ ঘন্টা সময় শেখার জন্য, আগামী ৬ মাস। তারপর প্রতিদিন ২-৪ ঘন্টা সময়, শেখা + পোর্টফোলিও তৈরি + কাজ খোঁজার জন্য আরো ৬ মাস।

ধৈর্য ধরে চেষ্টা করলে এক সময় সাফল্য আসবেই। ফ্রিল্যান্সিং কোন রকেট সাইন্স নয়। অন্যরা সফল হতে পেরেছে, আপনিও পারবেন। দরকার শুধু সঠিক পথে এগিয়ে চলা।

কাজী মাহমুদ বিন আবদুল্লাহ
সিইও, কাজী নিশাত আইটি



Source link

Leave a Reply