Categories
News

শিশুর শরীরে কুরআনের আয়াত ভেসে উঠার দাবিটি মিথ্যা


প্রতি শুক্রবার এই শিশুটির শরীরে ফুটে ওঠে কুরআনের আয়াত” শীর্ষক শিরোনামের একটি ভিডিও বেশ কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন ভূঁইফোড় অনলাইন পোর্টাল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রচারিত হচ্ছে। 

গণমাধ্যমে প্রচারিত এরকম সংবাদ দেখুন দৈনিক ইনকিলাব (আর্কাইভ)।

ভূঁইফোড় অনলাইন পোর্টালে প্রচারিত প্রতিবেদন দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে
প্রতিবেদনগুলোর আর্কাইভ ভার্সন দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে

২০১৯ সালে প্রচারিত এরকম পোস্ট দেখুন  এখানে, এখানে, এখানে
পোস্টগুলোর আর্কাইভ দেখুন এখানে, এখানে, এখানে

২০২০ সালে ফেসবুকে প্রচারিত এরকম একটি পোস্ট দেখুন এখানে
পোস্টটির আর্কাইভ দেখুন এখানে

গুজবের সূত্রপাত

কি-ওয়ার্ড সার্চের মাধ্যমে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্সে ২০০৯ সালে ২২ অক্টোবর “Miracle” baby gives hope in Russian Muslim south” শীর্ষক শিরোনামের একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।

উক্ত প্রতিবেদনে বর্নিত শিশুটির সাথে কুরআনের আয়াত শরীরে ভেসে উঠার দাবিতে প্রচারিত শিশুটির হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

অর্থাৎ, প্রচারিত ঘটনাটি ২০০৯ সালের নিশ্চিত হওয়া যায়।

“Pinkish in color and several centimeters high, the Koranic verse “Be thankful or grateful to Allah” was printed on the infant’s right leg in clearly legible Arabic script this week, religious leaders said. Visiting foreign journalists later saw a single letter after the rest had vanished.”

যার ভাবার্থ করলে দাঁড়ায়,

শিশুটির ডান পায়ে বেশ কয়েক সেন্টিমিটার জুড়ে হালকা গোলাপি বর্নে কুরআনের বাণী আরবিতে লেখা যার বাংলা ‘আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকো’। ছবিতে স্পষ্ট দেখা গেলেও বিদেশি সাংবাদিকরা আসলে শিশুটির পায়ে একটি আরবি হরফ দেখা যায় এবং পুরো লাইনটি অদৃশ্য হয়ে যায়।

এছাড়াও, abc news ২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর প্রকাশিত “Koran Verses Appear Mysteriously on Infant’s Body” শীর্ষক শিরোনামের একটি সংবাদ পাওয়া যায়। 

এছাড়াও, টেলিগ্রাফ, ডেইলি মেইল, গার্ডিয়ান, হাফিংটন পোস্ট সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদটি সেসময় প্রচারিত হয়।

উক্ত সংবাদগুলো থেকে জানা যায়, শিশুটির নাম আলি ইয়াকুবভ ( Ali Yakubov), মা মদিনা একজন গৃহকর্মী এবং বাবা শামিল একজন পুলিশ কর্মকর্তা। এই এলাকায় বেশ যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে । ইসলামপন্থী বেশ কিছু সশস্ত্র গ্রুপ মাঝেমাঝেই সেখানে হামলা চালায়। তাদের দমন করার জন্য সরকারী রাশিয়ান বাহিনীও বিভিন্ন সময় আক্রমণ করে। এই পটভূমিতে এই ‘অলৌকিক শিশু’র জন্ম স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। আলি ইয়াকুবভ কে দেখার জন্য তাদের বাসার সামনে দূর দূরান্ত থেকে অনেক দর্শনার্থী আসছে।

অর্থাৎ উক্ত ঘটনা থেকে বুঝা যায়, যুদ্ধাবস্থায় শিশুটির জন্ম ও হাতে, পায়ে কুরআনের আয়াত ভেসে উঠার খবরটি ওই অঞ্চলের মানুষদের উপর বেশ প্রভাব ফেলে।

তবে ঘটনাটি বিভিন্নসময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত হলেও মূলত এটি ২০০৯ সালের ঘটনা।

সত্য নাকি গুজব?

ডিসকভারি ম্যাগাজিনে ২০০৯ সালের ৪ নভেম্বর প্রকাশিত “Koran verses “appear” on baby in Russia” শীর্ষক শিরোনামের একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। উক্ত প্রতিবেদনের লেখক Phil Plait বলেন, শিশুটির শরীরে কোনো জন্মদাগ থাকলে সেটি সবসময় স্থায়ী হতো। যেহেতু শরীরে লেখা ভেসে ওঠার পর আবার মিশে যায় সেক্ষেত্রে কেউ হয়তো শিশুর ত্বকে কোনোকিছুর মাধ্যমে লেখাটি লিখে থাকেন। ছাড়াও যেকোনো কালি দিয়ে লিখলে লেখাটি মুছে যাওয়ারই কথা।

এছাড়াও, আলি সিনা ডট অর্গ নামের একটি ওয়েবসাইট জানাচ্ছে, এটা বিরল এক ধরনের চর্মরোগ হতে পারে। Dermatographic urticaria নামের চর্মরোগের ক্ষেত্রে রোগীর শরীরে আঁকা বাঁকা অনেক রেখা ফুটে ওঠে, যার সাথে অনেক সময় পরিচিত কোনো ভাষার অক্ষরের মিল পাওয়া যায়।

ডেইলি মেইলে ২০০৯ সালের ১৯ অক্টোবর “Miracle or hoax? “Russians puzzled as phrases from the Koran appear ‘spontaneously’ on baby’s skin” শীর্ষক শিরোনামের একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। উক্ত প্রতিবেদনে আলৌকিকতা নাকি গুজব হিসেবে ঘটনাটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়।

উক্ত বিষয়ে নিউইয়র্ক পোস্টে ২০১১ সালের ২২ জানুয়ারি “Russian spy Anna Chapman debuts TV show” শীর্ষক শিরোনামের একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। উক্ত প্রতিবেদনে শরীরে কুরআনের আয়াত ভেসে উঠা শিশুটির ব্যাপারে আলোচনা করা হয়। যেখানে একজন আরবী ভাষার বিশারদ গায়ে ভেসে উঠা লেখায় বানানগত ভুল আছে বলে জানান।

অর্থাৎ, লেখাগুলো অস্বাভাবিক বা স্রষ্টা প্রদত্ত হলে বানানগত ভুল থাকার কথা নয়।

নিউইয়র্ক টাইমসে ২০০৯ সালের ২৩ অক্টোবর “Village Miracle’s Glow Dims Under an Ex Spy’s Glare” শীর্ষক শিরোনামের একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়।

নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে একজন গোয়েন্দার বক্তব্য এবং আরবি লেখা বিশারদের বানান ভুলের বক্তব্যের পর থেকে উক্ত শিশুর পরিবার আর সাংবাদিকদের সামনে আসে নি। এমনকি ঘটনাটি পরবর্তীতে ওই অঞ্চলের স্থানীয়রাও বাচ্চাটি সম্পর্কে বেশিকিছু জানে নি।

উল্লেখ্য, ২০০৯ এর আলোচিত এ ঘটনা পরবর্তী সময়ে উক্ত ঘটনাটি ধামাচাপা পড়ে যায় এবং কোনো গণমাধ্যমেই উক্ত ঘটনার নিয়ে আর সংবাদ প্রচারিত হয় নি।

মূলত, আলি ইয়াকুবভ নামক শিশুর শরীরে ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কুরআনের আয়াত ভেসে উঠার খবরে বেশ আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। তবে বৈশ্বিক গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা সেখানে গেলে শিশুটির গায়ে একটি হরফের ন্যায় দাগ ছাড়া কিছুই দেখতে পায় নি। বিশেষজ্ঞরা মত দেন জন্মদাগ এভাবে কিছুদিন পরপর এসে আবার চলে যাওয়ার কথা নয় এবং দাগগুলো দেখে ত্বকের উপর কোনোকিছু দিয়ে লেখা হয়েছে বলেও বিশেষজ্ঞরা মত দেন। এছাড়াও শরীরে ভেসে উঠা লেখায় বানানগত ভুল ছিলো বলেও মন্তব্য করেন আরবি ভাষা বিশারদ।

অর্থাৎ, আলৌকিক লেখা ভেসে উঠার দাবি করা হলেও উক্ত ঘটনায় বেশকিছু বিষয় সন্দেহের তৈরি করে।

সুতরাং, শিশুর শরীরে কুরআনের আয়াত ভেসে উঠার দাবিটি মিথ্যা।

তথ্যসূত্র



Source link

Leave a Reply