Categories
News

নাসার সদর দপ্তরে ইন্টারনেট স্পিড ৯৯ জিবিপিএসের দাবিটি মিথ্যা


নাসার সদর দপ্তরে পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগতির ইন্টারনেট স্পিড ৯৯ GBPS” শীর্ষক শিরোনামের একটি তথ্য বিগত কয়েক বছর ধরে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার হয়ে আসছে।

কী দাবি করা হচ্ছে? 

ভারতীয় গণমাধ্যম Zee News ২০১৭ সালের এক প্রতিবেদনে বলেছে, নাসায় কম্পিউটারে ব্যবহার করা স্যাডো নেটওয়ার্ক, যার নাম ESnet এ অবিশ্বাস্য প্রতি সেকেন্ডে ৯১ গিগিবাইট গতিতে ইন্টারনেট ব্যবহার করা হয়।

Screenshot source: Zee News

ফেসবুকের পোস্টগুলোতে দাবি করা হয়েছে, “নাসার সদর দপ্তরে পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগতির ইন্টারনেট স্পিড ৯৯ GBPS।”

ফেসবুকে সাম্প্রতিক সময়ে ছড়িয়ে পড়া এমন কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে। আর্কাইভ ভার্সন দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে

বিগত বছরগুলোতেও একই তথ্য ব্যবহার করে ফেসবুকে পোস্ট ছড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে।

২০২১ সালের পোস্ট (আর্কাইভ)। 

২০২০ সালের পোস্ট (আর্কাইভ)। 

২০১৯ সালের পোস্ট (আর্কাইভ)। 

২০১৮ সালের পোস্ট (আর্কাইভ)। 

২০১৭ সালের পোস্ট (আর্কাইভ)। 

২০১৬ সালের পোস্ট (আর্কাইভ)। 

২০১৫ সালের পোস্ট (আর্কাইভ)। 

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে দেখা যায়, পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগতির ইন্টারনেট হিসেবে নাসার সদর দপ্তরের ৯৯ জিবিপিএস স্পিডের দাবিটি সঠিক নয় বরং ২০১৩ সালে এক্সপেরিমেন্টের অংশ হিসেবে একটি কনফারেন্স থেকে সংস্থাটির মেরিল্যান্ডের গডডার্ড সেন্টারে পাঠানো ফাইলের ট্রান্সফার স্পিড ছিল ৯১ জিবিপিএস।

কিওয়ার্ড সার্চের মাধ্যমে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম Bangalore Mirror এর ওয়েবসাইটে ২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল Fake News Buster:Internet speed at NASA is 91 GBPS শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, নাসায় ইন্টারনেট স্পিড ৯১ জিবিপিএস নয়। এই স্পিডটি একটি নির্দিষ্ট কানেকশনে ডেনভারে ‘সুপার কম্পিউটিং ১৩’ (SC13) কনফারেন্স এবং মেরিল্যান্ডে নাসার গডডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের (Goddard Space Flight Center) মধ্যে করা একটি এক্সপেরিমেন্টের অংশ ছিল। এই এক্সপেরিমেন্ট করা হয় মার্কিন প্রতিষ্ঠান এনার্জি সায়েন্স নেটওয়ার্ক (ESnet) এর মাধ্যমে। এই নেটওয়ার্কে প্রতি সেকেন্ডে ১০০ জিবিপিএস পর্যন্ত ফাইল স্থানান্তরের (file transfer) জন্য সংশ্লিষ্ট দুই সাইটকে অনুমতি দেয়৷

Screenshot source: Bangalore Mirror

এই তথ্যগুলোর সূত্র ধরে নাসার গডডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের ওয়েবসাইটে ২০১৩ সালে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত রিপোর্টটি খুঁজে পাওয়া যায়। নাসার উক্ত সেন্টারের ‘হাই এন্ড কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং’ (High End Computer Networking) টিমের তৈরি করা এই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নাসার এই রিসার্চ এক্সপেরিমেন্টটি পেটাস্কেল (১০^১৫) ধরনের বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য অত্যন্ত বড় আকারের ডাটা স্থানান্তরের সক্ষমতা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। এই এক্সপেরিমেন্টে সেকেন্ডে ১০০ জিবিপিএস সার্কিটে বেশকিছু ওয়াইড এরিয়া নেটওয়ার্ক (WAN) এবং লোকাল এরিয়া নেটওয়ার্ক (LAN) ব্যবহার করা হয়েছিল।

Screenshot source: NASA

এই এক্সপেরিমেন্টে সে সময় ডেনভারে SC13 থেকে মেরিল্যান্ডে গডডার্ড সেন্টারে ৯১ জিবিপিএস স্পিডে ফাইল ট্রান্সফার করা গিয়েছিল।

Screenshot source: NASA

নাসার উক্ত রিপোর্টে ফাইল ট্রান্সফারের একটি গ্রাফচিত্রও দেখানো হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, x100ssd ফাইলগুলো ডেনভার থেকে মেরিল্যান্ডে ট্রান্সফার করা হয়েছে। 

Screenshot source: NASA

এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে নাসার গডডার্ড সেন্টারের ‘হাই এন্ড কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং’ (High End Computer Networking) টিমের প্রধান বিল ফিন্ক সহ একাধিক সদস্যদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে রিউমর স্ক্যানার। কিন্তু এই প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকে সাড়া পাওয়া যায় নি।

সুপার কম্পিউটিং কনফারেন্সে নাসা

গবেষক, বিজ্ঞানী, ডেভেলপারসহ প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়মিত বার্ষিক কনফারেন্স আয়োজিত হয়ে আসছে। সুপার কম্পিউটিং (SC) নামের এই কনফারেন্সের শুরুটা আশির দশকে, ১৯৮৮ সালে। এই কনফারেন্সে সাধারণত প্রযুক্তি বিষয়ক প্রদর্শনী, কারিগরী সমস্যা, স্টুডেন্ট প্রোগ্রাম, অ্যাওয়ার্ড প্রদানসহ নানা আয়োজন থাকে। সালের শেষ দুই সংখ্যা অনুযায়ী প্রতিবছরের কনফারেন্সের নামকরণ হয়ে থাকে। এ বছর যেমন SC22 অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে টেক্সাসের ডালাসে আগামী ১৩ থেকে ১৮ নভেম্বর।

অনুসন্ধানে রিউমর স্ক্যানার জেনেছে, নাসার গডডার্ড সেন্টারের ‘হাই এন্ড কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং’ (High End Computer Networking) টিম ২০১০ সাল থেকেই অনিয়মিতভাবে এই কনফারেন্সের সক্ষমতা পরীক্ষায় অংশ নেয়। ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর এবং পরবর্তীতে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে এই পরীক্ষায় নাসা’র অংশগ্রহণ করার ব্যাপারে তথ্য মিলেছে। ২০১৭ সালে সর্বশেষ অংশ নেওয়ার পর এ সংক্রান্ত নাসার প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা গেছে, সে সময় ১০০ গিগাবিট সক্ষমতার চারটি সার্কিটের মাধ্যমে ডেনভারে SC17 থেকে মেরিল্যান্ডে গডডার্ড সেন্টারে ৩৮৯ জিবিপিএস স্পিডে ফাইল ট্রান্সফার করা গিয়েছিল।

Screenshot source: NASA

গডডার্ড সেন্টারই কি নাসার সদর দপ্তর?

মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা’র প্রথম স্পেস ফ্লাইট কমপ্লেক্স হিসেবে ১৯৫৯ সালের পহেলা মে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডের গ্রিনবেল্টে প্রতিষ্ঠিত হয় গডডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টার। বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের মিলনস্থল হয়ে ওঠা এই সেন্টার থেকেই হাবল টেলিস্কোপ পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে উৎক্ষেপিত জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের প্রোভিং গ্রাউন্ডও ছিল এই সেন্টার। পৃথিবী, সূর্য, সোলার সিস্টেম এবং বৈশ্বিক নানান গবেষণায় অবদান রেখে চলেছে নাসার এই শাখা প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে নাসার সদর দপ্তরের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে। অর্থাৎ, গডডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টার নাসার সদর দপ্তর নয়।

নাসার সদর দপ্তরে ইন্টারনেট স্পিড কত?

নাসার সদর দপ্তরে ইন্টারনেট স্পিডের বিষয়ে জানতে সংস্থাটির ওয়েবসাইটে গিয়ে কোনো তথ্য খুঁজে পাওয়া যায় নি। এ সংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক কোনো সংবাদমাধ্যমে নির্দিষ্ট কোনো অফিসের ইন্টারনেট স্পিড বিষয়ক তথ্য সম্বলিত কোনো সংবাদ প্রতিবেদনও খুঁজে পাওয়া যায় নি। 

সবচেয়ে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সুবিধা কোথায়?

দ্রুতগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবায় বিশ্বে প্রথম অবস্থানে রয়েছে সিঙ্গাপুর। দেশটিতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট স্পিড ২১৯.০১ এমবিপিএস। তবে মোবাইল ইন্টারনেট স্পিডে প্রথম অবস্থানে আছে নরওয়ে (১২২.৭৭ এমবিপিএস)।

মূলত, ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডেনভারের এক কনফারেন্স থেকে মেরিল্যান্ডে নাসার গডডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারে করা এক ফাইল ট্রান্সফার এক্সপেরিমেন্টে ৯১ জিবিপিএস স্পিড পাওয়া যায়। সর্বশেষ ২০১৭ সালে একই পরীক্ষায় ৩৮৯ জিবিপিএস স্পিড পাওয়া যায়। এই স্পিড নাসার নিয়মিত ইন্টারনেট স্পিড নয়। তাছাড়া নাসার সদর দপ্তর ওয়াশিংটনে, মেরিল্যান্ডে নয়। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগতির ইন্টারনেট স্পিড হিসেবে ৯১ জিবিপিএস স্পিডকে নাসার সদর দপ্তরের ইন্টারনেট স্পিড দাবিতে বিগত কয়েক বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার হয়ে আসছে।

উল্লেখ্য, জাপানী প্রকৌশলীরা গত বছরের নভেম্বরে সবচেয়ে দ্রুতগতির ইন্টারনেট রেকর্ড করার দাবি করেন। সেকেন্ডে ৩১৯ টেরাবিটের এই গতি আগের রেকর্ডের (১৭৮ টেরাবিট, যুক্তরাজ্য ও জাপানী বিজ্ঞানীদের উদ্যোগ) চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ।

প্রসঙ্গত, ওকলা স্পিড টেস্টের গত মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গতিতে বাংলাদেশের (৩২.৯৯ এমবিপিএস) অবস্থান ১০০তম। বাংলাদেশের মোবাইল ইন্টারনেট গতি ১০.৪২ এমবিপিএস।

সুতরাং, নাসার সদর দপ্তরে পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগতির ইন্টারনেট স্পিড ৯৯ GBPS দাবিটি মিথ্যা। 

তথ্যসূত্র



Source link

Leave a Reply