Categories
News

ব্ল্যাক মাম্বা সাপ বিষয়ক তথ্যগুলোর সত্যতা কতটুকু?


আপনি কি জানেন? সাপটির নাম ব্ল্যাক মাম্বা। ভয়ঙ্কর এই সাপের দেখা মেলে আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে।” শীর্ষক শিরোনামের একটি সাপের ছবিসহ কিছু তথ্য পোস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বিগত কয়েক বছর ধরে প্রচার হয়ে আসছে। 

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এমন কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে। আর্কাইভ ভার্সন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে।

কী দাবি করা হচ্ছে? 

ছড়িয়ে পড়া পোস্টটিতে একটি সাপের ছবি যুক্ত করা হয়েছে, কালো রঙের ফণা বের করে রাখা সাপটি সম্পর্কে ছবির নিচে লেখা হয়েছে, “আপনি কি জানেন? সাপটির নাম” ব্ল্যাক মামবা” ভয়ঙ্কর এই সাপের দেখা মেলে। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষ্যাপাটে স্বভাবের জন্য এরা বিশ্বে প্রথম। একই সারিতে ১২ বারের বেশি কামড় দেয়। এদের প্রতিটি কামড়ে ১০০-১২০ গ্রাম বিষ বের হয় যা ১০-১৫ জন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট। মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যেই মানুষ মৃত্যুর কবলে ঢলে পড়ে।” 

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ব্ল্যাক মাম্বার প্রতি কামড়ে ১০০-১২০ গ্রাম বিষ বের হয় না এবং একসাথে ১০-১৫ জন মানুষের মৃত্যুও হয় না বরং সাধারণত ২৮০ মিলিগ্রাম বিষ বের হয় এবং প্রতি কামড়ে কতজন মানুষের মৃত্যু হয় সেটি নিয়ে বিতর্ক আছে।

কিওয়ার্ড সার্চের মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকা ভিত্তিক সাপ বিষয়ক সংস্থা African Snakebite Institute এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত একটি তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি বিশালাকৃতির ব্ল্যাক মাম্বা’য় (Black Mamba) সর্বোচ্চ ৪০০ মিলিগ্রাম বিষ থাকা সম্ভব। তবে গড়ে এদের ২৮০ মিলিগ্রামের কাছাকাছি বিষ থাকে। 

Screenshot source: African Snakebite Institute

এ বিষয়ে জানতে সংস্থাটির সিইও জোহান মারাইসের (Johan Marais) সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে রিউমর স্ক্যানার। তবে ব্যবসায়িক কাজে দেশের বাইরে থাকায় তৎক্ষনাৎ কোনো জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। 

এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউজউইক’ও (Newsweek) বলেছে, “ব্ল্যাক মাম্বা’য় সর্বাধিক ৪০০ মিলিগ্রাম বিষ থাকতে পারে। তবে এটি বিরল। অধিকাংশ সময়েই ২৮০ মিলিগ্রাম বিষ থাকে।”

ব্ল্যাক মাম্বা কতটা ভয়ংকর?

আফ্রিকার ভয়ঙ্করতম সাপ হিসেবে পরিচিত ব্ল্যাক মাম্বা সাপের বৈজ্ঞানিক নাম Dendroaspis polylepis। ব্ল্যাক মাম্বা দ্রুত, স্নায়বিক, প্রাণঘাতী বিষাক্ত এবং হুমকির সম্মুখীন হলে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। এই সাপকে অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হয়েছে এবং আফ্রিকান মিথগুলো কিংবদন্তি অনুপাতে সাপগুলোর ক্ষমতাকে অতিরঞ্জিত করে তুলেছে। এই কারণে, ব্ল্যাক মাম্বাকে ব্যাপকভাবে বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক সাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

মার্কিন সিনিয়র বন্যপ্রাণী বিষয়ক জীববিজ্ঞানী সারা ভিয়েরনাম (Sara Viernum) এর বরাতে বিজ্ঞান বিষয়ক ওয়েবসাইট Live Science জানিয়েছে, “যখন ব্ল্যাক মাম্বা হুমকিতে থাকে তখন তারা অত্যন্ত আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। তখন বারবার আঘাত করে এবং প্রতিটি কামড়ের সাথে প্রচুর পরিমাণে বিষ ঢুকে যায় ভুক্তভোগীর শরীরে।”

Screenshot source: African Snakebite Institute

মার্কিন এনসাইক্লোপিডিয়া World Book বলছে, “ব্ল্যাক মাম্বা দ্রুত ধারাবাহিকভাবে ১২ বার পর্যন্ত আঘাত করতে পারে। সাপের মুখের উপরের পাটির লম্বা দাঁত দক্ষতার সাথে এর অত্যন্ত শক্তিশালী বিষকে ভুক্তভোগীর শরীরে প্রবেশ করাতে পারে।”

African Snakebite Institute জানিয়েছে, “একজন মানুষের মৃত্যুর জন্য সাপের প্রতি কামড়ে প্রায় ১৫-২০ মিলিগ্রাম বিষের প্রয়োজন হয়।” 

আফ্রিকার বৃহত্তম গেম রিজার্ভ হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ আফ্রিকার Kruger National Park কর্তৃপক্ষ বলছে, “একটি ব্ল্যাক মাম্বার কামড় জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে যদি কামড় পরবর্তী লক্ষণগুলো কামড়ের এক ঘন্টার মধ্যে দেখা দেয়। এতে শ্বাসযন্ত্র বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সব কামড় অবশ্য মারাত্মক নয়। সাপের কামড় কোথায় এবং কতটা বিষ ইনজেকশন করা হয়েছিল তার উপর নির্ভর করে, কেউ কামড় থেকে বাঁচতে পারে – এমনকি অ্যান্টিভেনম ব্যবহার না করেও।”

Screenshot source: Kruger National Park

Kruger National Park কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, “একজন মানুষ ব্ল্যাক মাম্বার কামড়ের ৪৫ মিনিটের মধ্যে মারা যেতে পারে। চিকিত্সা ছাড়াই ব্ল্যাক মাম্বার কামড় আপনাকে মারার জন্য ৭ থেকে ১৫ ঘন্টা সময় নিতে পারে। একজন ব্যক্তির কামড়ের পরে যত তাড়াতাড়ি চিকিত্সা করা হয়, তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা তত বেশি। 

তবে ব্ল্যাক মাম্বার বিষে ঠিক কত সময়ের মধ্যে মানুষের মৃত্যু হয় সেটি নিয়ে বিতর্ক দেখেছে রিউমর স্ক্যানার। National Geographic যেমন জানিয়েছে, ব্ল্যাক মাম্বার কামড়ে ২০ মিনিটের মধ্যেই মৃত্যু হতে পারে। নিউজউইক অবশ্য বলছে, ব্ল্যাক মাম্বার কামড়ে ৩০ মিনিটের মধ্যেই মৃত্যু হতে পারে। 

Kruger National Park কর্তৃপক্ষ বলছে, ব্ল্যাক মাম্বার বিষ অত্যন্ত বিষাক্ত। বিষের মাত্র দুটি ফোঁটা একজন মানুষকে মেরে ফেলতে পারে এবং একটি মাম্বার বিষদাঁতগুলোতে ২০ ফোঁটা পর্যন্ত বিষ থাকতে পারে। 

Screenshot source: Kruger National Park

ছবিটি ব্ল্যাক মাম্বা’র নয়? 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্ল্যাক মাম্বার যে ছবিটি ছড়িয়েছে সেখানে দেখা গেছে, সাপটির গায়ের রং গাঢ় কালো। নামের সাথে ব্ল্যাক অর্থাৎ কালো শব্দটি থাকায় স্বাভাবিকভাবেই সকলের কাছে মনে হতে পারে সাপটির গায়ের রং কালো’ই হবে। রিভার্স ইমেজ সার্চ পদ্ধতিতেও ভারতীয় সংবাদমাধ্যম India Times এর ওয়েবসাইটে ব্ল্যাক মাম্বা দাবিতেই একই ছবি খুঁজে পাওয়া যায়। 

Screenshot source: India Times

আফ্রিকা ভিত্তিক নাইজেরিয়ান নিউজ প্লাটফর্ম Legit.ng প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনেও ব্ল্যাক মাম্বা বিষয়ক অংশে আলোচিত ছবিটি খুঁজে পাওয়া যায়। 

Screenshot source: Legit.ng

কিন্তু অধিকতর অনুসন্ধানে রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, নামের সাথে কালো শব্দটি থাকলেও ব্ল্যাক মাম্বা নামটি এসেছে মূলত তাদের মুখের ভেতরের অংশের নীল-কালো অংশের জন্য৷ 

National Geographic বলছে, ব্ল্যাক মাম্বা সাধারণত জলপাই থেকে ধূসর রংয়ের হয়ে থাকে। 

Image source: Tad Arensmeier

তবে African Snakebite Institute বলছে ভিন্ন কথা। কালো রংয়ের ব্ল্যাক মাম্বা থাকার কথা উড়িয়ে না দিয়ে সংস্থাটি জানিয়েছে, “ব্ল্যাক মাম্বা খুব কমই কালো রঙের হয়। এর সামগ্রিক রঙ সাধারণত জলপাই সবুজ, গাঢ় জলপাই, ধূসর বাদামী, হালকা ধূসর বা পিতল ধূসর হয়। কিন্তু কিছু বয়স্ক ব্যক্তিদের রং খুব গাঢ় হতে পারে এবং দূর থেকে কালো বলে মনে হতে পারে। কিশোরদের বেশিরভাগই হালকা থেকে মাঝারি ধূসর রঙের হয় এবং হালকা পেট থাকে। ব্ল্যাক মাম্বার মুখের ভিতরের অংশ সাধারণত গাঢ় কালি কালো হয় তবে হালকা কালোও চোখে পড়ে। “

Image source: Johan Marais / African Snakebite Institute

মূলত, আফ্রিকার ভয়ঙ্করতম সাপ হিসেবে পরিচিত ব্ল্যাক মাম্বার প্রতি কামড়ে সাধারণত ২৮০ মিলিগ্রাম বিষ থাকে। সাধারণত বিষের মাত্র দুটি ফোঁটা একজন মানুষকে মেরে ফেলতে পারে এবং এই সাপ একসাথে একাধিক কামড় বসাতে পারে। তবে এক কামড়ে কত জন মারা যায় এবং একজনের মৃত্যু হতে কত সময় লাগে সেটি নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু ব্ল্যাক মাম্বার এক কামড়ে ১০০-১২০ গ্রাম বিষ থাকে যা ১০-১৫ জন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের মৃত্যু হয় এবং ১৫ মিনিটের মধ্যেই মানুষ মৃত্যুর কবলে ঢলে পড়ে দাবি করে একটি তথ্য 

সুতরাং, ব্ল্যাক মাম্বা বিষয়ে ফেসবুকে প্রচার হয়ে আসা তথ্যগুলো আংশিক মিথ্যা। 

তথ্যসূত্র 



Source link

Leave a Reply