Categories
News

মৃত্যুর পূর্বে জীবন সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেননি স্টিভ জবস


“মৃত্যুর আগে স্টিভ জবস হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে জীবন সম্পর্কে কিছু অসাধারণ কথা বলেছিলেন” শীর্ষক শিরোনামের একটি বক্তব্য স্টিভ জবস দিয়েছেন দাবিতে বিগত কয়েক বছর ধরেই গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে প্রচার হয়ে আসছে।

গণমাধ্যমে প্রচারিত এমন প্রতিবেদন দেখুন – ঢাকা টাইমস (আর্কাইভ), PBA (আর্কাইভ)।

ফেসবুকে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া এমন কিছু পোস্ট দেখুন – এখানে, এখানে এবং এখানে। আর্কাইভ ভার্সন দেখুন – এখানে, এখানে এবং এখানে

বিগত কয়েক বছরে ছড়িয়ে পড়া এমন কিছু পোস্ট দেখুন – এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে। আর্কাইভ ভার্সন দেখুন – এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে

ইউটিউবে প্রচারিত এমন কিছু ভিডিও দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে। ভিডিওগুলোর আর্কাইভ ভার্সন দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে

Claim Video

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে স্টিভ জবস জীবন সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেননি বরং তিনি OH WOW এই দুইটি শব্দ তিনবার উচ্চারণ করেছিলেন।

কি-ওয়ার্ড সার্চের মাধ্যমে ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এর ওয়েবসাইটে ২০২০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর Fact check: Final words of Steve Jobs were not about wealth শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।

Screenshot from reuters werbsite

প্রতিবেদনটিতে রয়টার্স জানায়, “জবসের বক্তব্য দাবিতে যে কথাগুলো প্রচার হয়ে আসছে সেই বক্তব্য যে জবস-ই দিয়েছেন তার কোনো প্রমাণ রয়টার্স খুঁজে পায়নি।”

জবসের মৃত্যুর দিন পাঁচেক পর ২০১১ সালের ১৬ অক্টোবর ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির মেমোরিয়াল চার্চে জবসের স্মরণে আয়েজিত একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়েছিলেন জবসের বোন মোনা সিম্পসন (Mona Simpson)। রয়টার্স জানিয়েছে, “সেই বক্তব্যের শেষ দিকে মোরা সিম্পসন বলেছেন, স্টিভের চূড়ান্ত শব্দগুলো মৃত্যুর কয়েক ঘন্টা আগে তিনবার পুনরাবৃত্তি হয়েছিল। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে জবস তার বোন প্যাটির দিকে, তারপরে দীর্ঘ সময়ের জন্য তার বাচ্চাদের দিকে, তারপরে তার জীবন সঙ্গী লরেনের দিকে এবং তারপরে তাদের কাঁধের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। স্টিভের শেষ কথা ছিল OH WOW. OH WOW. OH WOW।”

মার্কিন সংবাদমাধ্যম The New York Times সে বছরের (২০১১) ৩০ অক্টোবর A Sister’s Eulogy for Steve Jobs (আর্কাইভ) শিরোনামে মোরা সিম্পসনের পুরো বক্তব্যটি প্রকাশ করে। বক্তব্যের শেষদিকে রয়টার্সের দেওয়া উদ্ধৃতিটি খুঁজে পাওয়া যায়।

Screenshot from nytimes werbsite

তাছাড়া, মার্কিন লেখক ওয়াল্টার আইজাকসন (Walter Isaacson) এর লেখা স্টিভ জবসের আত্মজীবনীমূলক বই ‘STEVE JOBS‘ এও এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য খুঁজে পাওয়া যায় নি। 
মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে স্টিভ জবসের জীবন সম্পর্কে বক্তব্য দেওয়া সংক্রান্ত কোনো খবর যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক কোনো নির্ভরযোগ্য গণমাধ্যমেই খুঁজে পাওয়া যায় নি। রয়টার্স বলছে, জবস যদি এ ধরনের বিস্তারিত বক্তব্য দিতেন তাহলে সেটির রেকর্ড থাকতো এবং সেটি জায়গা পেত তার আত্মজীবনী, বিভিন্ন বই এবং গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে স্টিভ জবসের ছোট মেয়ে ইভ জবসের (Eve Jobs) সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে রিউমর স্ক্যানার। কিন্তু এই প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত তার উত্তর পাওয়া যায় নি।

গুজবের সূত্রপাত

ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান Snopes বলেছে, ২০১৫ সালের নভেম্বরে স্টিভ জবসের আলোচিত বক্তব্য দাবি সম্বলিত পোস্টগুলো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। কিন্তু রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, একই বছরের (২০১৫) জুলাইয়েও বাংলাদেশী ফেসবুক ব্যবহারকারীদের এ সংক্রান্ত পোস্ট দিতে দেখা গেছে। সে বছরের ৪ জুলাই এ সংক্রান্ত বাংলা ভাষায় প্রথম একটি পোস্ট (আর্কাইভ) খুঁজে পাওয়া যায়। Ataur Rahman নামক অ্যাকাউন্ট থেকে করা এই পোস্টের তথ্যসূত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়, ‘সংগৃহীত ও ইংরেজি থেকে অনুবাদকৃত’। 

পরবর্তীতে কিওয়ার্ড সার্চের মাধ্যমে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত একই বক্তব্য সম্বলিত ঐ বছরের অসংখ্য পোস্ট খুঁজে পাওয়া যায়। (পোস্টগুলো দেখুন এখানে, এখানে। আর্কাইভ দেখুন এখানে, এখানে)।

তবে, ছড়িয়ে পড়া পোস্টগুলোতে বক্তব্যটির উৎস বা সূত্র উল্লেখ করা হয় নি।

কেমন ছিল শেষ দিনগুলো?

২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতেই জবস জানতে পারেন তিনি আর খুব বেশিদিন বাঁচবেন না। শুরুর দিকে ঘনিষ্ঠজনরা এই খবর জানলেও কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। জবসের প্যালো অ্যাল্টোর বাড়িতে তাই শুভাকাঙ্ক্ষীদের ঢল লেগেই ছিল। কিন্তু শেষ সপ্তাহগুলোতে কঠোর সীমাবদ্ধতায় কেটেছে জবসের দিনগুলো। তিনি সেই সময়টায় ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও চিকিৎসক ডিন অর্নিশ, ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট জন ডোয়ের, অ্যাপল বোর্ডের সদস্য বিল ক্যাম্পবেল এবং ডিজনির প্রধান নির্বাহী রবার্ট এ ইগার সহ দীর্ঘদিনের সহকর্মীদের বিদায় জানিয়েছিলেন। কাজপাগল জবস শেষ সময়ে এসেও কাজ থেকে দূরে সরে থাকেন নি। আইফোন ফোরএস উন্মোচন করার বিষয়ে তিনি অ্যাপলের নির্বাহীদের পরামর্শ দেন সে সময়। তিনি তার আত্মজীবনী লেখক ওয়াল্টার আইজ্যাকসনের সাথেও এ সময় কথা বলেছেন। জবস একটি নতুন ওষুধও গ্রহণ করতে শুরু করেছিলেন এবং কিছু বন্ধুদের বলেছিলেন যে এটায় আশার কারণ ছিল। তবে বেশিরভাগ সময়টাই তিনি তার স্ত্রী এবং সন্তানদের সাথে কাটিয়েছেন।

মূলত, অ্যাপলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস ২০১১ সালের ৫ অক্টোবর মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে পরিবারের সাথেই সময় কাটান। এ সময় তার বলা শেষ কথাগুলো ছিল OH WOW. OH WOW. OH WOW। তবে, ‘মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে বিছানায় শুয়ে জবস জীবন ও সম্পদ সম্পর্কে তার উপলব্ধি জানিয়েছিলেন’ দাবি করে ভিত্তিহীন কিছু বক্তব্য গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমগুলোয় বহুবছর যাবত প্রচার হয়ে আসছে, যেগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা।

উল্লেখ্য, মার্কিন বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাপল’ এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস ২০১১ সালের ৫ অক্টোবর প্যানক্রিয়েটিক ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ৫৬ বছর বয়সে মারা যান। ২০০৪ সালে প্যানক্রিয়েটিক টিউমর অপসারণ এবং ২০০৯ সালে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করার পরও ক্যান্সার তার পিছু ছাড়ে নি। শারীরিক বিভিন্ন জটিলতা নিয়েই পরের দুই বছর অ্যাপলের দায়িত্ব সামলে গেছেন জবস।

প্রসঙ্গত, ১৯৭৬ সালের পহেলা এপ্রিল স্টিভ ওজনিয়াককে সাথে নিয়ে ‘অ্যাপল’ প্রতিষ্ঠা করেন স্টিভ জবস। শারীরিক নানান জটিলতায় ২০১১ সালের ২৪ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটির সিইও পদ থেকে সরে দাঁড়ান জবস। এর প্রায় ছয় সপ্তাহ পরই মারা যান তিনি।

সুতরাং, মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে জীবন সম্পর্কে স্টিভ জবসের বক্তব্য দাবিতে প্রচারিত তথ্যটি মিথ্যা।

তথ্যসূত্র



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published.